April 16, 2026, 12:54 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে সরকার নতুন এক ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে। ‘ফুয়েল পাস’ নামের মোবাইল অ্যাপভিত্তিক এই সিস্টেমের মাধ্যমে জ্বালানি তেল বিতরণ প্রক্রিয়ায় একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। রাজধানী ঢাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শুরুতেই সীমিত আকারে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের নিয়ে এই পাইলট প্রকল্প চালু করা হলেও ভবিষ্যতে সব ধরনের যানবাহনকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকার নির্দিষ্ট সাতটি ফিলিং স্টেশনে বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা চালু রয়েছে। যদিও বাস্তবে সব স্টেশনে সমানভাবে এর ব্যবহার এখনো দৃশ্যমান নয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে এটি ধাপে ধাপে কার্যকর করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষণ চলছে, আবার কোথাও সিস্টেম সেটআপ ও প্রস্তুতির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে—এই পাইলট প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করে তা পর্যায়ক্রমে আরও বিস্তৃত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার পর চট্টগ্রাম মহানগরীতে এই ডিজিটাল ফুয়েল বিতরণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এটি সম্প্রসারণ করা হবে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মে মাস থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় পর্যায়ক্রমে এই সেবা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
‘ফুয়েল পাস’ মূলত একটি ডিজিটাল যাচাই ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে কোনো যানবাহন যদি বৈধভাবে নিবন্ধিত না হয়, তাহলে সেটি এই সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না। একই সঙ্গে একটি যানবাহন কতটুকু জ্বালানি নেবে, কতবার নেবে—সবকিছু নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ থাকবে। এতে করে দিনে একাধিকবার অতিরিক্ত জ্বালানি নেওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই সিস্টেম চালুর ফলে প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হবে, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়ক হবে। সরকার প্রয়োজনে যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি গ্রহণের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করতে পারবে, বিশেষ করে সংকটকালীন সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিআরটিএর ডাটাবেজ এবং জ্বালানি বিভাগের সিস্টেমের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (API)-এর সীমাবদ্ধতার কারণে সব তথ্য একসঙ্গে সহজভাবে সংযুক্ত করা যাচ্ছে না। এ কারণে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কাজ চলছে।
এছাড়া মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক ফিলিং স্টেশনে এখনো পর্যাপ্ত স্মার্টফোন, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ বা প্রশিক্ষিত জনবল নেই। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্টেশন কর্মীদের ধাপে ধাপে এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত করে তোলা হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আইসিটি শাখার প্রোগ্রামার মো. মাফরুল আলম জানিয়েছেন, বর্তমানে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ চালু হয়নি, বরং পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। সফলভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন হলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে আলাদা লাইন বা নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালুর নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে, যাতে ফুয়েল পাস ব্যবহারকারীরা আলাদাভাবে সেবা নিতে পারেন।
সব মিলিয়ে, সরকার মনে করছে এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পরিবর্তন আসবে। জ্বালানি তেল বিতরণে অনিয়ম কমবে, অপচয় নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ধীরে ধীরে এটি দেশের পরিবহন ও জ্বালানি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।